কুয়াকাটার পর্যটনশিল্পে ধস
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
২২-০৬-২০২৬ ০২:৪৩:১৮ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
২২-০৬-২০২৬ ০৩:৩২:১৫ অপরাহ্ন
ফাইল ছবি
পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম টনকেন্দ্র কুয়াকাটাকে ঘিরে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছিল। সহজ যোগাযোগব্যবস্থার কারণে পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে, এমন প্রত্যাশা ছিল ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের। কিন্তু নানা জটিলতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে সেই সম্ভাবনা আজ অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।
২০১৩ সালে কুয়াকাটার জন্য একটি মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গেজেট প্রকাশ করা হলেও আজও তা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। পরে আরও দুটি পরিকল্পনা যুক্ত হওয়ায় মূল মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় আটকে আছে। ফলে পরিকল্পিত নগরায়ণের পরিবর্তে বর্তমানে কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা ছাড়াই যেখানে-সেখানে হোটেল, রিসোর্ট ও বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে।
নতুন বিনিয়োগকারীদের ভবন নির্মাণের জন্য বিভাগীয় কমিশনারের অনুমোদন নিতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ ও জটিল হওয়ায় অনেক উদ্যোক্তা বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। অন্যদিকে অনেক স্থানীয় উদ্যোক্তা নিজেদের মতো করে ভবন নির্মাণ করায় ভবিষ্যতে নগর ব্যবস্থাপনায় আরও জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কুয়াকাটাকে পর্যটন নগরী ঘোষণা করা হলেও ঢাকার রাজউক বা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মতো কোনো স্বতন্ত্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়নি। ২০১৩ সালে মাস্টারপ্ল্যান অনুমোদনের পরই যদি একটি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করা হতো, তাহলে পরিকল্পিতভাবে নগরায়ণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন সম্ভব হতো। পাশাপাশি পৌরসভা, পর্যটন করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে উন্নয়ন কার্যক্রমও কাঙ্ক্ষিত গতি পাচ্ছে না। ফলে দেশের অন্যান্য পর্যটনকেন্দ্রের তুলনায় কুয়াকাটা ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে উপকূলীয় এই পর্যটন নগরীর প্রধান আকর্ষণ সমুদ্রসৈকত রক্ষায়ও কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। বিগত সরকারের আমলে প্রায় ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে কুয়াকাটা সৈকত রক্ষা প্রকল্পের প্রস্তাবনা থাকলেও তা বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। বর্তমানে স্থায়ী কোনো সমাধানের পরিবর্তে প্রতিবছর খণ্ডকালীন ও অস্থায়ী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। টেকসই ও নান্দনিক সৈকত রক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়ন না হলে ভবিষ্যতে কুয়াকাটার অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়তে পারে। এ ছাড়া, সৈকতের বিভিন্ন স্থানে জিও ব্যাগ স্থাপনের কারণে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও অনেকাংশে নষ্ট হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়নেও রয়েছে বড় ধরনের ঘাটতি। বহু প্রতীক্ষিত মেরিন ড্রাইভ সড়কের কাজ ধীরগতিতে এগোচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রকল্পটি শেষ হতে আরও সময় লাগতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত চার লেন মহাসড়ক দ্রুত বাস্তবায়ন, অভ্যন্তরীণ সড়ক প্রশস্তকরণ, ওয়াকিং ওয়ে নির্মাণ, আধুনিক ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ ছাড়া, কুয়াকাটা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে একটি আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর নির্মাণের দাবিও দীর্ঘদিনের। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিমানবন্দর নির্মিত হলে দেশি-বিদেশি পর্যটক ও বিনিয়োগকারীদের আগমন বাড়বে, যা কুয়াকাটার পর্যটনশিল্পে নতুন গতি সঞ্চার করবে।
ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটার (টোয়াক) সভাপতি রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেছেন, কুয়াকাটার পরিকল্পিত উন্নয়নের জন্য ২০১৩ সালের মাস্টারপ্ল্যান দ্রুত বাস্তবায়ন, একটি স্বতন্ত্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন, স্থায়ী সৈকত রক্ষা প্রকল্প গ্রহণ এবং মেরিন ড্রাইভ সড়কের কাজ দ্রুত শেষ করা জরুরি। পাশাপাশি ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত চার লেন সড়ক এবং আধুনিক বিমানবন্দর নির্মাণের মতো অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে কুয়াকাটার পর্যটনশিল্প নতুন গতি পাবে। অন্যথায় দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় এই পর্যটনকেন্দ্র আরও পিছিয়ে পড়বে।
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম মোতালেব শরীফ বলেছেন, ২০১৩ সালে অনুমোদিত মাস্টারপ্ল্যান আজও বাস্তবায়ন না হওয়ায় কুয়াকাটার পরিকল্পিত উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ না থাকায় বিনিয়োগকারীরা নানা জটিলতার মুখে পড়ছেন এবং নতুন স্থাপনা নির্মাণেও বাধার সৃষ্টি হচ্ছে।
তিনি আরও বলেছেন, চার বা ছয় লেন সড়ক এবং মেরিন ড্রাইভ বাস্তবায়ন না হওয়ায় পর্যটন খাত প্রত্যাশিতভাবে এগোতে পারছে না। পাশাপাশি সৈকত রক্ষায় স্থায়ী ব্যবস্থা না থাকায় এর সৌন্দর্য ও নিরাপত্তা— উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কুয়াকাটার পর্যটনশিল্পকে এগিয়ে নিতে দ্রুত মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন এবং যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়ন জরুরি।
পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী বলেছেন, কুয়াকাটার পরিকল্পিত উন্নয়নে সরকার কাজ করছে। সমুদ্রসৈকত রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকল্প প্রস্তাবনা প্রস্তুত করছে এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হয়েছে। পর্যটন আকর্ষণ বাড়াতে কুয়াকাটা-সুন্দরবন রিভার ক্রুজ চালুর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে এবং রাখাইন সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে একটি পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেছেন, সৈকত এলাকায় শৃঙ্খলা, পরিচ্ছন্নতা ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন কাজ করছে। হোটেল ও খাবারের অতিরিক্ত মূল্য আদায় রোধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। এ ছাড়া সৈকতের ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো অপসারণ এবং ভবিষ্যতে পায়রা বন্দর ও পর্যটনশিল্প ঘিরে বিমানবন্দর স্থাপনের বিষয়টিও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।
কুয়াকাটার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে সমন্বিত পরিকল্পনা, কার্যকর প্রশাসনিককাঠামো এবং দ্রুত অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দেশের একমাত্র সমুদ্রসৈকত, যেখানে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত— দুটোই উপভোগ করা যায়, সেই কুয়াকাটা তার সম্ভাবনার তুলনায় আরও পিছিয়ে পড়বে।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স